মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

উপজেলার ঐতিয্য

রাজবাড়ী সদর উপজেলার লোক সংস্কৃতিঃ

 

 

পদ্মা, হড়াই বিধৌত রাজবাড়ী সদরের লোক সংস্কৃতি এ উপজেলার নিজস্ব প্রাণের ঐশ্বর্য্যকে ভিন্নতর আঞ্চলিক পরিচয়ে চিহ্নিত করেছে। এর ভাষাগত, ধ্বনিগত, অনেক সময় কাহিনীগত ও বিষয় বৈচিত্রে নিজস্ব আঞ্চলিকতা সহজ-সরল প্রাণময়ী গন্ধ স্পর্শ ও শব্দমালা রাজবাড়ী উপজেলার আবহমান স্রোতধারার শাশ্বত রূপ পরিলক্ষিত হয়।

 

ভৌগলিক কারণে এ উপজেলার কোন অঞ্চলের মানুষ আরামপ্রিয় আবার কোন অঞ্চলের লোক সংগ্রামীও বটে। বিশেষকরে পদ্মা নদীর অববাহিকার মানুষ প্রতিবছর সংগ্রামের মধ্যে বেঁচে থাকে। একসময় গান,বাজনা, আসর মজলিশে এবং বিভিন্ন পূঁর্জা পার্বন উৎসবে এ উপজেলার গ্রামাঞ্চল মুখরিত ছিল। বর্তমানে জটিল জীবন প্রবাহে যদিও সাধারণ জীবনযাত্রা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে তবু প্রত্যমত্ম অঞ্চল থেকে এখনও ভেসে আসে বৈচিত্রধর্মী গানের সুর। যা আমাদের লোক সংস্কৃতির ভান্ডারকে ঐশ্বর্য মন্ডিত করেছে। এ পর্যমত্ম এ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে যে সমসত্ম লোক ঐতিহ্য সংগৃহিত হয়েছে ঐসব বিষয়ভিত্তিক বিন্যাসের মাধ্যমে একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা তুলে ধরা হ’লঃ

 

 

ছড়াধর্মী লোক ঐতিহ্যঃ

 

 

সাধারণ ছড়াঃছেলে ভুলানো ছড়া, ঘুম পাড়ানো ছড়া, সামত্মনার ছড়া, বিবাহ বিষয়ক ছড়া, নীতিমূলক ছড়া, প্রাকৃতিক বিষয়ক ছড়া, জীবজন্তু বিষয়ক ছড়া, উৎসর বিষয়ক ছড়া, বিদ্রম্নপাত্বক ছড়া, ভৎর্সনামূলক ও শামিত্ম বিধায়কমূলক ছড়া, করম্নণ রসাশ্রিত ছড়া, অভিশাপমূলক ছড়া, জামাত মস্করার ছড়া, হৃদয় বেদনা প্রকাশ ছড়া ইত্যাদি।

 

ছেলে খেলার ছড়াঃহাতটাবুটি খেলা, ঘুঘুসই, পুতুল খেলা, বৌছি খেলা বা ছিবুড়ি হাতিসুরি খেলা, চিলহাস খেলা, মুলস্নু রম্নমাল চুরি, হাডুডু খেলা বুদ্ধিমন্ত্র, জলকেলি, অপেন্টি বাইসকোপ, গায়ছা মায়ছা খেলা ইত্যাদি।

 

বিবিধ ছড়াঃগাশ্শির ছড়া, মাছধরা ছড়া, মাছ টানার ছড়া, গোয়ালের ডাক বোল, সূর্য্য পূজার গান, ভাই ফোটা শোলক, হ্যাচড়া পূজার গান, প্রবাদ বাক্য, ধাঁ-ধাঁ হেয়ালি মন্ত্র-তন্ত্র বৈঠক শেস্নাক বৃষ্টির গান।

 

 

আনুষ্ঠানিক গান (আনন্দ প্রধান)ঃ

 

মেয়েলি গীত, প্রাক-বিয়ের প্রসত্মাবের গীত, বিয়ের পয়গামের গীত, বিয়ের সওদা করার গীত, হলুদ বাটার গীত, বর সাজানোর গীত, আশির্বাদমূলক গীত, আমন্ত্রণ গীত, বিয়ে বাড়ীতে কন্যা পক্ষের অভিযোগের গীত, পান-সুপারির গীত, বাসী বিয়ের গীত, বরের বানিজ্য যাত্রার গীত, মান-অভিমানের গীত, সংসারের অভাব-অভিযোগের গীত, শিশু জন্ম উপলক্ষ্যে গীত ইত্যাদি। পালকীর গান, সারি গান (নৌকা বাইচের গান), ছাদ পেটানোর গান, বার মাইস্যা গান, রাখালী, গাইনের, খতনার গীত, বেদে-বেদেনীর গান, কর্মজীবি মহিলাদের গান ইত্যাদি।

 

 

অনানুষ্ঠানিক গান (তত্ব প্রধান)ঃ

 

হুলোই গান (মাঙ্গন গীতি), নাইলা গান (বৃষ্টির গান), ভাংড়া গান (মাঙ্গন গীতি), কবি গান, ফকিরী গান, ভাব সঙ্গীত, বিচার গান, বাউল গান, মরমী গান, মুর্শিদী গান, জারী গান, ধুয়া গান, সুরেশ্বরী গান, টরশির গজল, বিচ্ছেদ গান, অষ্টক গান।

 

 

লোক কাহিনীঃ

 

রম্নপকথার কিচ্ছা, লম্বা কিচ্ছা, ছোটদের কিচ্ছা, বোকার কিচ্ছা, পশুপাখির কাহিনী, কুসংস্কার, বেদের মেয়ে, মধুবালা, গৌরচাঁদ মাঝি, জামাল কামাল, চন্দ্রবানুর কিচ্ছা, হারমন ডাকাতের কিচ্ছা, মৃগ পরীর কিচ্ছা, দূর্লভ বাদশার কিচ্ছা, বক বকীর কিচ্ছা, বামন সাফার কিচ্ছা, কাহা-কুহু পাখির কিচ্ছা ইত্যাদি।

 

 

বাউল ও মরমী গানঃ

 

বাউল ও মরমী গান মুখে মুখে রচিত বলে এর পরিমান নিরূপন করা খুবই কঠিন। উপমহাদেশের বাউল ও মরমী গানে ফরিদপুর, যশোর ও কুষ্টিয়ার স্থান নিঃসন্দেহে শীর্ষে। সে আলোকে রাজবাড়ী সদর উপজেলাও আলোকিত হয়েছে ব্যাপকভাবে। এ অঞ্চলে কামার, কুমার, চাষী, দিনমজুর, খেটে খাওয়া মানুষের মুখে সর্বদা এসকল গান লেগেই আছে। বলা যায় এসকল গান এ অঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকার এক অন্যরকম অবলম্বন।

 

 

লোকজ মেলাঃ

 

লোকজ মেলা (আড়ং) লোক সংস্কৃতির একটি উলেস্নখযোগ্য অংশ। বিভিন্ন পূজা পার্বণ, ওয়াজ মাহফিল, পহেলা বৈশাখ, চৈত্র সংক্রামিত্ম, মাঘি পূর্ণিমা, দোল পূর্ণিমা, বড় দিন সহ বিভিন্ন গুরম্নত্বপূর্ণ পার্বণ উপলক্ষ্যে এ উপজেলায় বিভিন্ন মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এ মেলায় হসত্ম ও কুটির পণ্য সামগ্রী প্রদর্শিত ও বিক্রি হয়। এ পণ্য সামগ্রীতে লোকজ সংস্কৃতি পরিস্ফুট হয়ে উঠে। যেমন- পাঁচুরিয়া মেলা (রাজবাড়ী বারবনি সম্মানের দিন)।

 

 

হসত্ম ও কুটির শিল্পঃ

 

বৈচিত্রময় হস্ত ও কুটির শিল্পে আবহমান লোকসংস্কৃতির প্রতিফলন লক্ষনীয়। শিল্পী মনের আবেগ এবং অনুভূতির স্পর্শ এতে প্রতিফলিত হয়। এর নির্মাণ কৌশলে রয়েছে রাজবাড়ী সদর উপজেলার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট। এ উপজেলার গ্রাম গঞ্জে প্রাপ্ত কাঁচামাল যেমন- পাট, বাঁশ, বেত, মাটি, খেজুর পাতা, কাঠ থেকে মুলতঃ এগুলো উৎপন্ন হয়। তাছাড়া এখানে অনেক ঘরোয়া পরিবেশে তাঁত শিল্প গড়ে উঠেছে।  এ উপজেলা মেয়েরা ঘরে বসে শীতল পাটিসহ বিভিন্ন ধরনের নকশি কাঁথা, চাটাইয়ের কাজ, বাঁশ ও বেতের কাজ ইত্যাদি করে থাকে। এ ছাড়াও পাট দিয়ে বিভিন্ন ধরনের দড়ি, পুতুল, ব্যাগ, খেলনা সামগ্রী ইত্যাদি তৈরী করে থাকে। বাঁশ ও বেত, নকশা কুলা, ঝুড়ি, পোলো, ঢাক, শরকী, লাঠি, কোচ, ঢোল, মোড়া, ধামা, নকশি কাঁথা, হোগলা ও খেজুরের পাতার পাটি, মৃৎশিল্প, দেব-দেবীর মুর্তি, নকশা করা কালো হাতি, তৈজসপত্র, পিঠার সাজ, কারম্নকার্য খচিত মাটির হাড়ি ও কলসী, সিঁদুরের কৌটা, টালি, ভাদু সাহার মিষ্টি ভান্ডার, শংকর মিস্টান্ন ভান্ডার ইত্যাদি কুটির শিল্পের ক্ষেত্রে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। 

 

রাজবাড়ী উপজেলায় এ পর্যমত্ম বিসিক নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আত্মকর্মসংস্থার প্রকল্প থেকে ১৯০টি ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে ঋণ বিতরণ করেছে। সুতরাং এ উপজেলার লোকসংস্কৃতিতে কুটির শিল্প যে একটি বৃহৎ স্থান দখল করে আছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাছাড়া দুটি বৃহৎ শিল্পও গড়ে উঠেছে এখানে। একটিতে মুরগীর বাচ্চা উৎপাদন করা হয় এবং অপরটি টেক্সটাইল মিল।

 

 

বিলুপ্তির পথে বিভিন্ন পেশার লোকজনঃ

 

রাজবাড়ী সদর উপজেলাধীন কামার, কুমার, জেলা, তাঁতী, বেতি, কাসারী, স্বর্ণকার, নাপিত/শীল, ধোপা, মুচি, মেথর, বুনো-বাগদী, মাড়োয়ারী, বিহারী, ডুবরী, বিন্দু, মাইরে, বেদে, সাপুড়ে, কয়েল (ওজনদার), কুলু, দাওয়ালে, নিকারী, ডোম, চুনকার ইত্যাদি পেশার লোকজনের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। তবে এদের সংখ্যা অত্যন্ত নগন্য। তাদের পূর্বপুরম্নষ হতে প্রাপ্ত পেশা বর্তমানে তেমন কোন কর্মসংস্থান না থাকায় তাদের নিজ পেশা পরিবর্তন করে অন্যান্য পেশা গ্রহণ করছে।

 

 

রাজবাড়ী উপজেলায় উৎপাদিত ফলের বিবরণঃ

 

আম, কাঠাল, লিচু, কলা, পেয়ারা, নারিকেল, তরমুজ, বাঙ্গি, আমড়া, পেপেঁ, বেল, তাল, খেজুর, বরই, আপেলকুল, আতা, গাব, জামরুল, লটকন, কাঠবাদাম ইত্যাদি ফলের গাছের আধিক্য রয়েছে। এছাড়াও বসমত্মপুর এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে পেয়ারা, আপেলকুল, বাওকুল, আম ইত্যাদি ফলের চাষাবাদ হচ্ছে। বৈচি, গাব, কাঠবাদাম, আমলকি, জলপাই, ইত্যাদি ফলের গাছগুলো বর্তমানে বিলুপ্তির পথে।   ঃ