মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

রাজবাড়ী সদর উপজেলার পটভুমি

 

রাজবাড়ী সদর উপজেলার উৎপত্তি ও নামকরনের ইতিহাসঃ

 

রাজবাড়ী যে রাজার বাড়ী বা কোন রাজার বাড়ীর নামানুসারে নামকরন এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। তবে কখন থেকে ও কোন রাজার নামানুসারে রাজবাড়ী নামটি এসেছে তার সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। রাজবাড়ী নামটি লিখিত ভাবে কোন দলিল, মৌজা, পরগণা, খতিয়ান, নকশা এ জাতীয় প্রাচীন কোন কাগজপত্রে পাওয়া যায় না। যা পাওয়া যায় তা হল বিনোদপুর, গঙ্গাপ্রসাদপুর, লক্ষীকোল, ভবানিপুর, সজ্জনকান্দা, চককেষ্টপুর, কাশিমনগর ইত্যাদি। রাজবাড়ীদলিল দসত্মাবেজ গোয়ালন্দ বলেই পরিচিত ছিল। এ থেকে মনে করা যায় রাজবাড়ী নামটি কোন রাজার বাড়ীর নামে প্রথমে লোক মুখেই প্রচলিত ছিল। বাংলায় রেল ভ্রমন পুস্তকের (এল.এন.মিশ্র প্রকাশিত ইষ্ট বেঙ্গল রেলওয়ে ক্যালকাটা ১৯৩৫) একশ নয় পৃষ্ঠায় রাজবাড়ী সম্বন্ধে যে তথ্য পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে নবাব সায়েসত্মাখান ঢাকায় সুবাদার নিযুক্ত হয়ে আসেন। এই সময় এই অঞ্চলে পর্তুগীজ জলদস্যুদের দমনের জন্যে তিনি সংগ্রাম শাহ্কে নাওয়ারা প্রধান করে পাঠান। তিনি বানীবহতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন এবং লালগোলা নামক স্থানে দূর্গ নির্মাণ করেন। এই লালগোলা দূর্গ রাজবাড়ীর কয়েক কিলোমিটার উত্তরে বর্তমান লালগোলা গ্রাম। সংগ্রাম শাহ্ ও তার পরিবার পরবর্তিতে বানীবহের নাওয়ারা চৌধুরী হিসাবে পরিচিত হয়েওঠেন। এল.এন.মিশ্র উক্ত পুসত্মকে উলেস্নখ করেন রাজা সংগ্রাম শাহের রাজ কারবার বা রাজকাচারী ও প্রধান নিয়ন্ত্রনকারী অফিস লোকমুখে প্রচলিত বর্তমান রাজবাড়ী এলাকাকে কাগজে কলমে রাজবাড়ী লিখতেন। ঐ পুসত্মকের শেষের পাতায় রেলওয়ে ষ্টেশন হিসেবে রাজবাড়ী নামটি লিখিত দেখা যায়। উলেস্নখ্য রাজবাড়ী রেল ষ্টেশন ১৮৯০ সালে স্থাপিত। ঐতিহাসিক আনন্দনাথ রায় ফরিদপুরের ইতিহাস পুস্তকে বানিবহের বর্ণনায় লিখেছেন নাওয়ারা চৌধুরীগণ পাঁচথুপি থেকে প্রায় ৩০০ বছর পূর্বে বানিবহ এসে বসবাস শুরম্ন করেন। বানিবহ তখন জনাকীর্ণ স্থান।

 

বিদ্যাবাগিশ পাড়া, আচার্য পাড়া, ভট্টাচার্য পাড়া, শেনহাটিপাড়া, বশুপাড়া, বেনেপাড়া, নুনেপাড়া নিয়ে ছিল বানিবহ এলাকা। নাওয়ারা চৌধুরীগণের বাড়ী স্বদেশীগণের নিকট রাজবাড়ী নামে অভিহিত হত।

 

 

মতামত্মরে রাজা সূর্য্যকুমারের নামানুসারে রাজবাড়ীর নামকরণ হয়। রাজা সূর্য্যকুমারের পিতামহ প্রভুরাম  নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার রাজকর্মচারী থাকাকালীণ কোন কারনে ইংরেজদের বিরাগভাজন হলে পলাশির যুদ্ধের পর লক্ষীকোল এসে আত্মগোপন করেন। পরে তার পুত্র দ্বিগেন্দ্র প্রসাদ এ অঞ্চলে জমিদারী গড়ে তোলেন। তার পুত্র রাজা সুর্য্য কুমার ১৮৮৫ সালে জনহিতকর কাজের জন্য রাজা উপাধী প্রাপ্ত হন। রাজবাড়ী রেল ষ্টেশন এর নামকরণ করা হয় ১৮৯০ সালে। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী জানা যায় রাজবাড়ী রেল ষ্টেশন এর নামকরণ রাজা সূর্য্য কুমারের নামানুসারে করার দাবি তোলা হলে বানিবহের জমিদারগণ প্রবল আপত্তি তোলেন। উলেস্নখ্যবর্তমান যে স্থানটিতে রাজবাড়ী রেল ষ্টেশন উক্ত জমির মালিকানা ছিল বানিবহের জমিদারদের। তাদের প্রতিবাদের কারনেই ষ্টেশনের নাম রাজবাড়ীই থেকে যায়। এর পরেই রাজা সূর্য্য কুমারের নিজ জমিদারীতে তার নামানুসারে সূর্য্যনগর ষ্টেশন স্থাপিত হয়েছিল। এই সকল বিশেস্নষণ থেকে ধারণা করা যায় রাজবাড়ী নামটি বহু পূর্ব থেকেই প্রচলিত ছিল। এলাকার নাওয়ারা প্রধান, জমিদার, প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তিগণ রাজা বলে অভিহিত হতেন। তবে রাজা সূর্য্য কুমার ও তার পূর্ব পুরম্নষগণের লক্ষীকোলের বাড়ীটি লোকমুখে রাজার বাড়ী বলে সমাধিক পরিচিত ছিল। এভাবেই আজকের রাজবাড়ী।

 

ঐতিহাসিক পটভূমি ও ক্রমবিকাশঃ

প্রাচীন গঙ্গা রাষ্ট্র এবং পরে বঙ্গের পূর্বাঞ্চল রাজবাড়ী হিসেবে অভিহিত। এ অঞ্চল ৭ম ও ৮ম শতকে বারক মন্ডল এবং ১০ম শতকে কুমার তালোক মন্ডল রাজ্যের অধীনে ছিল। ষোড়শ শতকে বার ভুইয়াঁদের মধ্যে অন্যতম ভুষনার রাজা মুকুন্দরাম ও যশোররাজ প্রতাপাদিত্যের অধিকারে সুবাদার শায়েসত্মাখানের সময়ে সংগ্রাম শাহ্ এর নাওয়ারা মহল এবং রাজা সীতারামের রাজ্যভুক্ত হয়। সীতারামের মৃত্যুর পর রাজবাড়ী দীঘাপতিয়ার রাজা দয়ারাম, নাটোর রাজ রামজীবন ও রানী ভবানীর জমিদারভূক্ত ছিল। ১৮৭২ সালের আদমশুমারীতে এ অঞ্চলে ফরিদপুরের ৩টি মহকুমার উলেস্নখ পাওয়া যায়। এ তিনটি মহকুমা হল-গোয়ালন্দ, পাংশা ও বেলগাছি।

 

মহকুমা সদরের অফিস আদালত রাজবাড়ীতে থাকলেও কাগজে-কলমে নাম ছিল গোয়ালন্দ। লিখিতভাবে রাজবাড়ী নামটি এসেছে ১৮৯০ সালে স্থাপিত রেল ষ্টেশনকে ঘিরে । মূলত বিভিন্ন রাজা মহারাজার ঐতিহ্যকে মনে রেখেই এ অঞ্চল রাজবাড়ী হিসেবে প্রচারিত হয়েছিল। বৃটিশ শাসনামলে ১৮৮৮ সালে রাজবাড়ী থানা প্রতিষ্ঠা পায়। রাজবাড়ী থানার নাম কাগজে-কলমে ছিল গোয়ালন্দ। গোয়ালন্দ ঘাটের নদী ভাঙ্গনের কারণে ১৮৭৫ সালে প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো রাজবাড়ীতে স্থা্নামত্মর করা হয়। রাজবাড়ীর নামটি রেল ষ্টেশন (১৮৯০) ও রেলের স্থাপনা কাগজ-পত্রে লিখিত হওয়ার বিষয়টি চালু হলে পরবর্তীতে তা রাজবাড়ী থানা সদর হিসাবে পরিচিতি পায়।

 

          ১৯৬২ সালে রাজবাড়ী পৌরসভা থেকে পূর্বদিকে নির্জন এলাকা শ্রীপুরে সার্কেল অফিস (উন্নয়ন) এবং তৎসঙ্গে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী অফিস স্থাপন করা হয় এবং একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসবাসের জন্য আবাসিক ব্যাবস্থা গড়ে তোলা হয়। ২৩ নভেম্বর ১৯৮৩ সালে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ফরিদপুর জেলার গোয়ালন্দ মহকুমা সদর, রাজবাড়ী সার্কেল অফিসকে তৎকালীন সরকার প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে রাজবাড়ী সদরউপজেলা হিসেবে ঘোষনা করে যা ১ ডিসেম্বর ১৯৮৩ সাল থেকে কার্যকর হয় একইসাথে দেশের ৬৩টি মহকুমা সদরে ৬৩টি সদর উপজেলার কার্যক্রম শুরম্নহয়। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকার সকল উপজেলাকে থানা নামকরণ করলে পূনরায় রাজবাড়ী থানা এবং ২০০০ সালে তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকার সকল থানাকে উপজেলায় রূপান্তরিত করলে তখন থেকে রাজবাড়ী সদর উপজেলা হিসাবে কার্যকর হয়ে আসছে। এখানে উলেস্নখ্য ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ সরকারী অধ্যাদেশের মাধ্যমে সকল মহকুমাকে জেলা ঘোষনা করা হলে গোয়ালন্দ মহকুমা রাজবাড়ী জেলা হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়।

         

রাজবাড়ী প্রাচীনকাল থেকেই রাজনীতি সচেতন। ফকিরসন্যাস আন্দোলন, অনুশীলন, যুগামত্মর, স্বদেশী আন্দোলন. মুজাহিদ আন্দোলন, ফরায়েজি আন্দোলন, সিপাহী বিদ্রোহ সহ বৃটিশ বিরোধী বহু আন্দোলন এখানে গড়ে উঠেছিল। এছাড়াও কমিউনিষ্ট আন্দোলন, উণসত্তরের গণআন্দোলন, রেল শ্রমিক আন্দোলন, সর্বপরি স্বাধীনতা সংগ্রামে রাজবাড়ীর ভূমিকা ইতিহাস খ্যাত। ঃ